যৌন শিক্ষা এবং আমাদের যতসব ভ্রান্ত ধারণা

যৌন শিক্ষা এবং আমাদের যতসব ভ্রান্ত ধারণা“স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে যৌন সুড়সুড়ি বিষয়ক বই বিতরণ” এই শিরোনামে গত ২৩ শে জুলাই একটা সামাজিক নেটওয়ার্ক মাধ্যমে প্রকাশিত একটা লেখা আমার এক লেখক বন্ধু আমাকে শেয়ার করেন। লেখাটি পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! লেখায় বইটির কার্যকরি বিষয়বস্তুগুলো নিঃসন্দেহে ফুঁটে উঠেছে নেতিবাচকভাবে। কারণ সেখানে কেবল কি উল্লেখ আছে তাই বলা আছে কিন্তু কেন বা এটা থাকার ইতিবাচক কারণ সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। কাজেই প্রত্যক্ষভাবে না হলেও আমি বলব একটা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব এই লেখায় আছে।

যৌন শব্দটা আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে এমনিতেই একটা নেতিবাচক আলোড়ন তৈরি করে। এর প্রথম এবং প্রধান কারণ হল বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ভ্রান্তধারনা। আমরা যৌন সম্পর্কিত বিষয় এর উল্লেখ হলেই মনে করি যৌন কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু এটা মটেই ঠিক নয়। যৌন শিক্ষা হল বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনা যা কিনা মানুষের যৌনতার (human sexuality) সাথে সম্পর্কিত। এটা আরও আলোচনা করে সেক্সচুয়াল এনাটমি(sexual anatomy), প্রজননতন্ত্র(sexual reproduction), যৌন কার্যক্রম(sexual activity), প্রজনন স্বাস্থ্য(reproductive health),আবেগিক সম্পর্ক(emotional relations), প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার ও দায়িত্ব(reproductive rights and responsibilities), যৌন সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত থাকা (abstinence) এবং জন্ম নিয়ন্ত্রন(birth control) নিয়ে। যৌন শিক্ষা আমরা সাধারণত পেয়ে থাকি আমাদের বাবা-মার কাছে থেকে। বাবা-মা ছাড়া আমাদের দেখা শোনার দায়িত্ব যাদের উপর বর্তায় তাদের কাছ থেকেও আমরা বিষয়টা সম্পর্কে জেনে থাকি।

 

এছাড়াও বিদ্যালয়ের ফর্মাল প্রোগ্রাম বা পাবলিক হেলথ ক্যাম্পেইনও এ বিষয়ে জানাতে ভূমিকা রাখেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরণের বিষয়ে আলোচনা করা হয় না। এই ধরণের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা আসলে সামাজিক ট্যাবু। তবে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষা দেবার দায়িত্ব বর্তায় আমাদের অভিভাবকদের উপর। তবে বেশিরভাগ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের বিবাহের পুর্বে এই জাতীয় বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে মুখ খুলতে চান না। কাজেই এমনিতেই অভিভাবকদের মধ্যে একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। এমন শিরোনামের খবরের প্রকাশ বাস্তবিকভাবেই তাদের মধ্যে একটা বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করবে বলা বাহুল্য। লেখায় উল্লেখ আছে যে বইটির শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন অধ্যায়ে লেখা আছে, ‘…যখন একটি মেয়ে ১০-১২ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন তার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়।‘ বইতে পরিবর্তনের বেশ কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে। আসলে বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরনের পরিবর্তনগুলো ঘটে। কিন্তু এই ধরনের পরিবর্তন যে স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে এবং সেটা সকলের সাথেই, সেটা বয়ঃসন্ধিকালের সকল ছেলেমেয়ে জানে না এবং বুঝতেও পারে না। সে কারনে তাদের জানা প্রয়োজন। কারণ নিজের শরীর সম্পর্কে না জানলে পরবর্তীতে যে কোন শারীরিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধা তৈরি হয়। একটা সংকোচও কাজ করে বটে।

 

বইতে মেয়েদের ঋতুস্রাব এবং ছেলেদের স্বপ্নদোষ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এগুলোও স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে। কিন্তু অভিভাবকবৃন্দ এমন পরিবর্তনের সঠিক কারণ এর ব্যাখ্যা তাদের ছেলেমেয়েদের দেন না এবং ছেলেমেয়েরাও এসব বিষয়ে কথা বলতে সংকোচবোধ করে। তারা মনে করে তাদের বড় রকমের একটা অসুখ হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোন বইতে যদি এইসকল ঘটনার ব্যাখ্যা থাকে তাহলে আমি সেটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখব। কারণ এটা ইন্টারনেটের যুগ। এযুগে অভিভাবক বা শিক্ষকরা তাদের ছেলেমেয়ে বা শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক বিষয় উল্লেখ না করলেও তারা সেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জেনে নেয়। যেটা কিনা তাদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল তৈরি করে। এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকেও এই সকল বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা তারা পায়। এই ধরনের ঘটনাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে গেলে আমি বলব আলোচনার দরকার আছে। এখন প্রশ্ন হল বইতে যেভাবে উল্লেখ আছে সেভাবেই কি আলোচনা হওয়া দরকার বা বইগুলো কি এভাবে অবাধে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিতরণ করাটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কিনা?

প্রথমত যৌন শিক্ষা ফরমালি হলে ভালো কিন্তু এ শিক্ষা ইনফরমালিও হতে পারে। বিশেষ করে অভিভাবক, বন্ধু বা কাছের কারও সাথে এই বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। বই পড়ে বা মিডিয়ার সাহায্য নিয়েও এই বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব। আসলে বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। কারণ এটা আসলে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলে। কাজেই এ শিক্ষা যদি স্কুলগুলোতে ফরমালি শেখানো হয় তাহলে বিষয়টির সামাজিক গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকখানি। তবে বয়ঃসন্ধিকালে অবাঞ্ছিত প্রেগনেন্সি নিয়ে সরাসরি আলোচনা নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট ফেলতে পারে। যা করা যতে পারে তা হল যৌন শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের অংশগ্রহণে সতর্কতামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি ফরমালি হোক বা ইনফরমালি হোক একটা সিলেবাস বা দিক নির্দেশনা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে স্কুলে চাকুরিরত শিক্ষকদের জন্য। ব্যাপারটা যেহেতু স্পর্শ কাতর কাজেই সাবধানতার সাথে উত্থাপন না করলে মানুষের মধ্যে একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।

শিক্ষকদের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে একটা সেমিনার বা বিষয়টি নিয়ে ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলার জন্য দিক নির্দেশনা স্বরূপ ট্রেনিং সেশন এর আয়োজন করতে পারলে ভালো হয়। মোদ্দা কথা হল যৌন শিক্ষার ইতিবাচক দিকটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিতে গেলে একটা সিলেবাস বা দিক নির্দেশনা থাকতেই হবে। একই সাথে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে গেলে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানও আয়োজন করার প্রয়োজন আছে। যাতে করে তাঁরা বয়ঃসন্ধিকালের এই সব ছেলেমেয়েদের সাথে যৌন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। এবার যৌনশিক্ষা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে একটা গল্প বলি। আমাদের দেশের এক স্কুল পড়ুয়া মেয়ে পড়ে ক্লাস সিক্সে। নিয়মিত স্কুলে আসে। ক্লাস করে।

একদিন ক্লাসরুমে তার হঠাৎ মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব। একটা দুটো ক্লাস করার পর আর ক্লাস করতেই পারেনি। মেয়েটির বাবা মাকে খবর দেয়া হয়। এরমধ্যে স্কুলের ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন মেয়েটি প্রেগনেন্ট। বাবা মা স্বভাবিকভাবেই স্তম্ভিত। কি করে বা কার মাধ্যমে ঘটনাটি ঘটেছে তা গুরুত্বপুর্ণ নয়। আসল কথা হল ঘটনাটি ঘটেছে এবং যৌনশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা থাকলে ঘটনাটি প্রেগনেন্সি পর্যন্ত যেতোই না! আপনারা হয়ত ভাবছেন আমি পরোক্ষভাবে যৌন সম্পর্ককে সাপোর্ট করছি। আসলে বয়ঃসন্ধিকালে নিজের শরীর সম্পর্কে কৌতূহল জাগাটা কোন নতুন ঘটনা নয়। এ সময়টাতে কৌতূহল বসত বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ভাবনাও স্বাভাবিক নিয়মে আসতে পারে। কারণ আমরা সমাজের সকল ছেলেমেয়েদের জন্য এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি। উপরে যে মেয়েটির ঘটনা বললাম, সে মেয়েটি একমাত্র মেয়ে এবং বাবা মা উভয়েই ভালো চাকরি করেন।

পারিবারিকভাবে নিঃসঙ্গ মেয়েটি তাই বিপথে পা বাড়িয়েছে। আমি একটা ভালো পরিবেশের কথা বললাম কিন্তু যারা ভালো পরিবেশ পায়না তাদের অবস্থা একবার ভাবুন। আসলে সমাজে ঘটমান সব সামাজিক অস্থিরতার সমাধান যৌনশিক্ষা হয়তবা নয়। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই ধরণের শিক্ষা যে টনিকের মত কাজ করবে আমি তার দাবীই করছি। আসলে যৌন শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ কারণ হল মহামারী আকারে এইডস এর ছড়িয়ে পরা। আমরা আফ্রিকাতে এইডস এর প্রকোপ সম্পর্কে জানি। এসকল স্বাস্থ্যগত কারণে তাই যৌন শিক্ষার গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকখানি। প্ল্যানড প্যারেন্টহুড নামক এক আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে যৌন শিক্ষার একটা বৈশ্বিক গুরুত্ব আছে। তাদের মতে যৌন শিক্ষা বিশেষ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে।

Related Posts