মহত্তম প্রেমের কবিতা

love-1.gifমানুষের প্রেম-ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে বিচিত্রভাবে। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপায়ে, বস্তুতে-প্রতীকে, শারীরিক-মানসিকভাবে, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে। পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজ-সংস্কৃতিভেদে এর প্রকাশ কিছুটা ভিন্ন হলেও এর রয়েছে সর্বজনীন রূপ। প্রেম এমন এক মানসাবস্থা যেখানে অন্যের জন্য আকুলতা-ব্যাকুলতা তীব্র হয়ে ওঠে। প্রেম এক ধরনের আকর্ষণ, মঙ্গলকামনা। প্রেম বিশুদ্ধ, স্বর্গীয়, মধুর, মহৎ। প্রেমের সঙ্গে কবিতার ওতপ্রোত সম্পর্ক। প্রেমের প্রতিটি উচ্চারণ কাব্যিক। সম্প্রতি লন্ডনে হয়ে গেলো প্রেমের কবিতাশিল্প উদযাপন অনুষ্ঠান। শব্দে-ছন্দে কবিরা কিভাবে প্রকাশ করেন মানুষের একান্ত আবেগের কথা, তারই বার্তা পাওয়া গেলো সেখানে।

প্রেম বিচিত্র বিভাময়। এই বিভা অনেকটাই ভাষাকেন্দ্রিক। প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশের জন্য প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ছিলো অন্ততঃ ত্রিশটি শব্দ। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষাগুলো একটি কি দুটি শব্দ দ্বারাই প্রেমের সমস্ত ভাব প্রকাশ করে, হোক সেটা শারীরিক-মানসিক আকর্ষণ কিংবা সন্তানের প্রতি পিতামাতার স্নেহ কিংবা সম্প্রদায়গত একতাবোধ। প্রেমানুভূতি প্রকাশক শব্দসম্ভার নিয়ে লন্ডনের সাউথব্যাঙ্ক সেন্টারে গ্রীষ্মব্যাপি ‘প্রেমের উৎসব’ (Festival of Love) শীর্ষক যে আয়োজন, যেখানে ইতিবাচক মানবীয় সম্পর্কের নানা মাত্রা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশভিত্তিক প্রীতি-অপ্রীতি, স্মরণ-বিস্মরণ, বিচ্ছেদ-বিরহ ইত্যাদি নানা বিষয়ও সেখানে স্থান পেয়েছে।

অনুষ্ঠানটি হয়েছে দ্বিবার্ষিক পোয়েট্রি ইন্টারন্যাশনাল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি। স্মরণ করা যেতে পারে, পোয়েট্রি ইন্টারন্যাশনালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্রিটিশ কবি টেড হিউস (সংগঠনটির জন্ম ১৯৬৭ সালে)। সারাবিশ্ব থেকে কবি সাহিত্যিকগণ এখানে এসেছেন। আমরা জানি না সেখানে কোনো বাঙালি কবি ছিলেন কিনা। থাকলে তিনি বাঙালি প্রেমাবেগের কথা নিশ্চয় প্রকাশ করে থাকবেন। জানাবেন, বাঙালি প্রেমের জাতি। বিশ্বকে অবহিত করবেন বাংলাদেশের মানুষের ভাষাপ্রেম ও দেশপ্রেমের কথা। শোনাবেন কাব্যরসিক বাঙালির প্রেমপ্রত্যয়: ‘প্রেমের অমর শিখা চিরকাল জ্বলে, স্বর্গ হতে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে।’

গত পঞ্চাশ বছরের পৃথিবীশ্রেষ্ঠ পঞ্চাশটি প্রেমের কবিতা পঠিত হয় অনুষ্ঠানে। আবৃত্তি শুরু হয় ল্যাংস্টন হিউজের ‘স্বপ্নরক্ষক’ (The Dream Keeper) কবিতাটি দিয়ে। অন্যান্য কবিতার মধ্যে ছিলো ডেরেক ওয়ালকটের বিখ্যাত ধর্মগীত ‘প্রেমের পর প্রেম’ (Love after Love)। (নিচে পাঠকদের জন্য কবিতাদুটির অনুবাদ দেওয়া হয়েছে)। পঞ্চাশটি কবিতা বিভক্ত ছিলো সাত প্রকার গ্রিক প্রেমের ধারণাকে কেন্দ্র করে। প্রেমের এই সপ্তবিভাজন হলো: ‘মানবপ্রেম’ (Agape), ‘পারিবারিক প্রেম’ (Storge), ‘চিরন্তন প্রেম’ (Pragma), ‘আত্মপ্রেম’ (Philautia), ‘সহানুভূতি’ (Philla), ‘ছেনালি’ (Ludus), ‘কাম’ (Eros)।

অনুষ্ঠানে চাউর হয় হেলেনিক গৌরবগাথা। গ্রিক ভাষাসম্পদ ছাড়িয়ে প্রেমের উচ্চারণ ছড়িয়ে পড়ে ত্রিশটি দেশ থেকে আগত বিভিন্ন ভাষার কবিকুলের মধ্যে। এ এক বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক প্রেমালোচনার পর্ব। মূল আলোচ্য বিষয়: ‘অন্য কোনো বিষয় প্রেমের মতো এতোটা ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে না।’ আলোচনা ও কবিতাপাঠ জমে ওঠে গদ্যেপদ্যে। দুইবার ম্যান বুকার পুরস্কারবিজয়ী ঔপন্যাসিক হিলারি ম্যান্টেলকে তাঁর প্রিয় প্রেমের কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উল্লেখ করেন ১৫৩০ সালের দিকে লেখা এক স্তবক:

‘দখিন হাওয়া বইবে যখন
পড়বে ঝরে বৃষ্টিফোঁটা
আহা রে প্রেম, ছটফটিয়ে
নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা!’

এই পদাবলি যে পাঁচশো বছর আগে রচিত হয়েছিলো তাতে কিছু আসে যায় না। এর সংবেদনশীলতা তখন যেমন ছিলো এখনো তেমনি তরতাজা। ম্যান্টেল ব্যাখ্যা করেন: ‘যে তার জন্মভূমি থেকে শতসহস্র মাইল দূরে, সে শুনতে পায় আগন্তুক ছাদের ওপর আগন্তুক বৃষ্টির শব্দ। ধ্রুপদী রহস্যময় সেই বৃষ্টিগানে তার দেহমন জেগে ওঠে।’ এই হলো প্রেম। আমরা কালিদাসের মেঘদূতের কথা স্মরণ করি, যেখানে নির্বাসিত যক্ষ মেঘের মাধ্যমে তার দূরস্থিত প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠায়। কী অপূর্ব কল্পনা, অপরূপ ব্যঞ্জনা!

প্রেমের ভাষা সর্বজনীন, আর প্রেমের কবিতাও সর্বজনবোধ্য। এদিক থেকে কবিতার সঙ্গে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার একটি বড় পার্থক্য বিদ্যমান। গল্পপ্রবন্ধ এবং কবিতা একই ঐতিহ্যে লালিত নয়। জন স্টলওয়ার্দি তাঁর The Penguin Book of Love Poetry বইয়ের ভূমিকায় বলেন: ‘ঘনঘোর অন্ধকার সময়প্রাঙ্গনে কেবল একটিমাত্র আলোকশিখা প্রজ্জ্বলিত নয়। বিচিত্র আলোকধারা এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতায় প্রবাহিত হয়েছে। আন্তরিক তাড়নায় মানবজাতির হৃদয়ে প্রেমের প্রদীপ জ্বলে উঠে, যা থেকে বিভিন্ন কালের ও স্থানের কবিগণ কবিতা লেখায় উদ্দীপনা পান।’ সাউথব্যাঙ্কের কবিসম্মেলনে তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেলো। ভারতীয় (তামিল) কবি কুট্টি রেভাথির মতে, প্রেম এক অনন্য অনুভূতি যা প্রতিটি মানুষের আত্মায় সাধারণভাবে ক্রিয়াশীল; পৃথিবীর প্রতিটি কোণে প্রেমবাণী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় নীরবে-নিভৃতে। সৌদি আরবের আশজান আল হেন্দির মতে, প্রেম এক বিশ্বজনীন ভাষা যা দেশ, ধর্ম ও জাতিগত গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রেমের কবিতাগুলো রোমান্টিক ভাবনাসমৃদ্ধ। এর মধ্যে পড়ে ঐতিহ্যবাহী ট্রুবাডুর গীতিকা, পেত্রার্কীয় ও শেক্সপিয়ারীয় সনেট এবং আবেগঘন ভিক্টোরিয় পদ্য। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হ্যারি এফ. হার্লো তাঁর ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘প্রেমের স্বরূপ’ (The Nature of Love) প্রবন্ধে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কম লিখেছি, আর সেই ঘাটতি পূরণ করেছেন কবিসাহিত্যিকগণ।’ আমাদের রোমান্টিক অনুভূতি প্রকাশের প্রয়োজন হলে আমরা সেই শব্দশিল্পীদের শরনাপন্ন হই।

কতোগুলো প্রেমের কবিতা বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যেমন, মার্কিন কবি মাইকেল ডোনাগির লেখা ‘উপহার’ (The Present), যেখানে ক্ষণকালের প্রিজমের মধ্য দিয়ে শাশ্বত প্রেম আভাসিত হয় (কবিতাটি নিচে অনূদিত হয়েছে)। ডোনাগির বিধবা পত্নী ম্যাডি প্যাক্সম্যান বলেন, ‘আমরা বুঝিনি আমাদের এটা এতো দরকার!’ তাঁর মতে, ‘সকল প্রেমের কবিতা প্রথমত কবিতা এবং দ্বিতীয়ত প্রণয়ের ঘোষণা।’ তিনি কবিতাটি আসরে পড়ে শোনান। তাঁর দাবি, ডোনাগির কবিতা ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়ে বেশি কিছু; যদিও স্ত্রীর জন্য লেখা, কিন্তু সেটা তাকে নিয়ে লেখা নয়। আর এজন্যই বিয়েশাদিতে এর এতো কদর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি আড্রিয়ান মিশেলের দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিয়া হিয়ুইট। তিনিও তাঁর মরহুম স্বামীর লেখা কবিতা ‘সেলিয়া, সেলিয়া’ পাঠ করেন। শৈল্পিক মহিমাগুণে মিশেল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে এক সর্বজনীন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছেন। প্রেমের কবিতায় থাকতে হয় পুলক, যা পাওয়া যায় ‘সেলিয়া, সেলিয়া’ কবিতায়:

‘আমি যখন ক্লান্ত এবং দুখি
সকল আশা যখন দূরাগত
হাই হলবর্ন পথে যখন হাঁটি
তখন আমি তোমার চিন্তারত।’

border=0ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে পুরুষকণ্ঠ অধিক প্রবল এবং নারীকণ্ঠ বিরল। যে-সকল নারী প্রেমের কবিতা লিখেছেন তাদের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার ব্যাপারটি বেশি কাজ করেছে। যেমন, এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিংয়ের সনেট ৪৩-তে আমরা দেখি প্রেমিকা তার প্রেমিককে কতোভাবে ভালোবাসে তার ফিরিস্তি দিচ্ছে (নিচে কবিতাটি অনূদিত হয়েছে)। এখানে আবগের প্রকাশই বড় কথা। এমিলি ডিকিনসনের প্রেমের কবিতায় কিছু আধ্যাত্মিক বার্তা থাকে। তিনি একটি কবিতায় (VIII) লিখেন:

‘সকল সময় বাসবো ভালো
চাইলে প্রমাণ দিতে পারি
তোমায় ভালোবেসেছি যে
যথেষ্ট নয়, আভাস তারই।

সকল সময় বাসবো ভালো
তোমায় সেটা দিতে পারি
জীবন মানে ভালোবাসা
অমরতায় দেবো পাড়ি।

তারপরও কি মনে তোমার
সন্দেহটা নড়েচড়ে?
চলো তবে ক্যালভ্যারিতে
ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ঘরে।’

যে-সব সমাজে মহিলাদের আচার-আচরণ প্রচণ্ডভাবে নিয়ন্ত্রিত সেখানে কবিতায় নারীকণ্ঠ স্বাভাবিকভাবে ক্ষীণ। রেভাথির কবিতা ‘স্তন’ (Breasts) এই বিষয়টিকে তুলে ধরে। কবি বলেন, তাঁর কবিতায় নারীজীবনের যে সমস্যার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে তা নিছক কল্পনাজাত নয় বরং তাঁর দেখা বাস্তব থেকে তুলে আনা। তিনি তাঁর কবিতাকে নিবেদন করেছেন যৌন হয়রানিসহ অন্যবিধ শারীরিক নির্যাতনের শিকার পৃথিবীর সকল নারীকে। তাঁর কবিতা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ জানায়। তাঁর মতে, কবিতাকে বিচার করতে হবে ইতিহাস ও সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কবিতা সবসময় মানবতার পক্ষে। রেভাথি বলেন, কেবল প্রেমের মাধ্যমেই আকাঙ্ক্ষিত পথে পৃথিবীর পরিবর্তন সম্ভব। প্রেমের কবিতা মানুষকে অধিক মানবিক হতে অনুপ্রাণিত করবে।

প্রেমের কবিতাকে কেবল নরনারীর পারস্পরিক আসক্তি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। এতে কেবল প্রেমের গৌরবই নষ্ট হয় না, একে মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়। প্রেমের কবিতা ব্যাপক পটভূমিতে বিস্তৃত হতে পারে। যেমন, আল হেন্দির কবিতা ‘অন্যের খোঁজে’ (In Search of the Other) পারস্পরিক যোগোযোগের জন্য মানুষের হৃদয়াকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে:

‘ইসাবেলা
প্রতিদিন কাউকে খোঁজে
আমাকে পেয়ে যায়
আমিও কাউকে খুঁজি
তাকে পেয়ে যাই
বলা হয়:
প্রাচ্য-প্রতীচ্য মিলবে না কোনোদিন
কিন্তু ইসাবেলা ও আমার
প্রতিদিন সাক্ষাৎ হয়
একে অন্যকে খোঁজার পথে’

মেসিডোনিয়ার কবি নিকোলা মেদজিরভ হাজির করেন তাঁর দীর্ঘ শিরোনামের কবিতা ‘কেউ চলে গেলে কৃতকর্ম ফিরে আসে’ (When Someone Goes Away Everything That’s Been Done Comes Back)। তাঁর কবিতা সম্মিলিত আবেগের কথা বলে: ‘বাসের আসন সর্বদা উষ্ণ / শেষ শব্দ বাহিত হয় / বাঁকা বালতির মতো দূর গ্রীষ্মের আগুনে।’ এখানে প্রেম-বিরহের কথা সূক্ষ্ণ ইঙ্গিতে বিধৃত।

কবিতা পঠিত হয় কবিদের নিজ নিজ ভাষায় এবং ইংরেজি অনুবাদে। অনুবাদে যদিও কবিতার মূল আবেদন অনেকটা হারিয়ে যায়, তথাপি বক্তব্য আঁচ করা যায়। চিন্তাটাই প্রধান, শব্দ নয়। তবু আশঙ্কা থেকেই যায়। রেভাথি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘অনুবাদ ভাষাগতভাবে ঠিক হলেও তা আবেগগতভাবে বেঠিক হতে পারে।’

প্রেম দ্রুতগতিতে কাজ করে। ভাষার ধারও ধারে না। প্রেমের অনুভূতি উচ্চারণের আগেই পৌঁছে যায় প্রেমিকহৃদয়ে। আল হেন্দি বলেন, প্রেম হলো মানুষের মহত্তম আবেগ। যেখানে প্রেম বিদ্যমান, সেখানে সহনশীলতা ও শান্তি বিরাজ করে। বর্তমান যুদ্ধ-হানাহানির যুগে এর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। প্রেম সকল প্রকার বেদনা দূরীভূত করে মানবজাতিকে অধিকতর ঘনিষ্ঠতায় আবদ্ধ করতে পারে। কবিরা প্রেমের রূপান্তরী ক্ষমতায় আস্তাবান। প্রেম একদিন পৃথিবীকে বদলে দেবে, এমনটাই আশা করেছেন সাউথব্যাঙ্ক সেন্টারে মিলিত প্রেমের কবিগণ।

(সম্প্রতি বিবিসিতে প্রকাশিত Lucy Scholes-এর ‘What are the greatest love poems?’ অবলম্বনে)

———————-

স্বপ্নরক্ষক
ল্যাংস্টন হিউজ

তোমার সব স্বপ্ন আমাকে দাও
স্বাপ্নিক
তোমার সকল হৃদয়ের গুঞ্জন
নীল মেঘের কাপড়ে মুড়ে
আকাশে ভাসিয়ে দেবো
পৃথিবীর কর্কশ আঙুল থেকে
বহু বহু দূরে।

প্রেমের পর প্রেম
ডেরেক ওয়ালকট

এমন সময় আসবে
যখন তুমি সানন্দে
নিজেকে অভ্যর্থনা জানাবে
আপন দুয়ারে
আয়নায় প্রতিবিম্ব
মুচকি হাসি, স্বাগতম!

বলবে, বসো, খাওয়াদাওয়া করো
আত্ম-আগন্তুক, ভালোবাসবে তাকে
মদ দেবে, রুটি দেবে, হৃদয়ও দেবে
তার হাতে, যে তোমায় ভালোবাসে

সারাটি জীবন অবহেলা
অন্য কেউ মনে মনে জেনেছে তোমাকে
গ্রন্থের তাক থেকে প্রেমপত্র ছুঁড়ে ফেলে দাও

আলোকচিত্র, বেপরোয়া নোট
আয়না থেকে তোমার চেহারা মুছে ফেলো
বসো, জীবনের উৎসব করো।

উপহার
মাইকেল ডোনাগি

উপহার দেবো উপহার দেবো একটাই আছে চাঁদ
দূরাকাশ থেকে পুকুরের জলে নামে জোছনার ঢল
কৃষ্ণ লেগুনে গোলকোজ্জ্বল নাই তাতে কোনো খাঁদ
বুঝে ফেলে সেটা তারাগবেষক এবং প্রেমিকদল।

বয়সটা তার কয়েক সেকেন্ড, আলোকের সম্পাৎ
জন্মের থেকে মিনিট সাতেক হবে তার ব্যবধান
মিটিমিটি জ্বলে দূরের তারারা শশাঙ্কহীন রাত
হয়তোবা আজ তাদের অনেকে নয় আর দ্যুতিমান।

এই মুহূর্তে তোমার চোখে যে কবিতার অক্ষর
সেটাও আদতে খুব অগোচরে ঘটে গেছে পূর্বেই
‘এখানে-এবং-এখন’ ধারণা বিভ্রম গুরুতর
ঘটনা সে এক হাসিতামাশায় সময়হারানো খেই
অতএব চলো দেয়ানেয়া করি উপহার মনোহর
তোমার আমার জীবন সুখদ কেটে যাবে এভাবেই।


সনেট ৪৩

এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং

কতো বিচিত্র প্রেমের পন্থা, আমি দেখি সেটা গুণে
কথা গভীরতা, প্রশস্ততা, উচ্চতা ভালোবাসি
চোখের আড়াল হলেও চিত্তে পৌঁছে তোমার হাসি
পরম সত্তা আদর্শরূপ চিনে নেই বাণী শুনে।

তোমার জন্য ভালোবাসা আছে প্রত্যহ ঘামনুনে
সূর্য এবং মোমবাতি আলো প্রয়োজন রাশিরাশি
ন্যায়ের জন্য সংগ্রামে প্রেম মুক্তির অভিলাষী
প্রেম পবিত্র, প্রশংসিত চিরকাল নিজগুণে।

ভালোবাসা আছে তীব্র উষ্ণ হৃদয়ের অনুরাগে
আমার পুরনো বিষাদ এবং শিশুকাল বিশ্বাসে
হারানো দিনের অমৃতকথা শুনতেও ভালো লাগে
সাধক আমার তুমি প্রবাহিত প্রত্যেক নিঃশ্বাসে
হাসিকান্নায় ভরা এ জীবন, জানেন স্রষ্টা আগে
তোমাকেই ভালোবাসবো যেদিন আশ্রিত মাটিঘাসে।

Related Posts