বোঝে না সে বোঝে না

বোঝে না সে বোঝে নাসংসারে সুখ ও কষ্ট পাশাপাশি থাকে। অন্ধকার আছে বলেই আলোর সৌন্দর্য আমরা অনুভব করতে পারি। তেমনি সংসারে দুঃখের উত্তাপেই সুখের পরশমণি মেলে। ভালোবাসার যাতনা বেশি হয় তখনই, যখন আপনার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো আপনার ভালোবাসার মানুষটি মূল্যায়ন করতে পারেন না। আবার অধরা পরম সুখ তখন খুব সহজে ধরা দেয়, যখন আপনার সঙ্গী কোনো চাওয়াকে মূল্যায়ন করেন।
মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য সব সময় অর্থ দিয়ে বিবেচনা না করে মাঝেমধ্যে মনটাকেও বিবেচনায় আনতে হয়। তাহলেই দেখবেন জীবনের একটা অর্থবহ ভিন্ন চেহারা নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। জীবনকে নতুনভাবে চিনতে, দেখতে ও বুঝতে পারবেন। যাতনার উল্টো পিঠে যে আনন্দময় জীবন, তা উপভোগ করতে পারবেন। প্রত্যেক মানুষ তাঁর সঙ্গীর কাছে প্রশংসা চায়, সন্তুষ্টি চায়। তাঁর ভালো লাগা, মন্দ লাগা—সবকিছুই ভাগাভাগি করতে চায়। আর তা ইতিবাচকভাবেই।

এক দম্পতির প্রথম বাচ্চার জন্মদিন উদ্যাপন করার খুব ইচ্ছা ছিল। করা হয়নি। কেন? টাকাপয়সার সমস্যা না। আত্মীয়স্বজনেরও সমস্যা না। বরং সবার আনন্দ-আগ্রহ বেশ ছিল। তাহলে কিসের সমস্যা? স্ত্রী বললেন, ‘আমি কোন শাড়ি অনুষ্ঠানে পরব? নতুন কোনো শাড়ি আমার সংগ্রহে নেই।’ তাঁকে একটা নতুন শাড়ি কিনে দিতে বললেন। স্বামীর টাকার অভাব নেই। আছে সময়ের অভাব। বিভিন্ন কাজের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রীকে কিনে নিতে বললেন। স্ত্রীর অন্য গোঁ। এত দিন যত কাজই থাকুক না কেন, তাঁর স্বামী পোশাক কিনতে বা কোন রং তাঁকে মানাবে, কোন পোশাকটা পরে যাবেন—এসব বিষয়ে মত দিতেন। অথচ বাচ্চার জন্মদিনের অনুষ্ঠান শুধু তাঁর নয়; সবারই। এখানে স্বামীর মতটা চাইছিলেন স্ত্রী। এটা কিছুতেই মানতে পারছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি কী পরব, কী করব—এসব বিষয়ে ও মত দিলে আমার ভালো লাগে। ও এই কাজটা না করায় এতই মন খারাপ হয়েছিল পরে আর ঘটা করে বাচ্চার জন্মদিন করিনি।’

সংসারে এই যে একজনের চাওয়া-পাওয়া, তা ছোট কিংবা বড় হোক—সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই তা করা উচিত। কালজয়ী কবি ও চিত্রকর উইলিয়াম ব্লেক (১৭৫৭-১৮২৭) যেমনটা বলেছেন সেই কবে—নিজের আকাঙ্ক্ষাকে সরবে জানালেই চলবে না। অন্যজনের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে। তুমি যখন অন্যের মনের চাহিদা পড়তে পারছ, কিছু করতে পারছ, তখনই তুমি তার হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারবে।

বলতে গেলে দুনিয়ার তাবৎ মনোবিদও এমনটা বলে গেছেন। সম্পর্কের সুন্দর বিনির্মাণে তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন বোঝাপড়াকে। চাওয়া-পাওয়াগুলো প্রকাশ্য হলে অবশ্যই সাধ্য অনুযায়ী মেটানো উচিত। আর যদি নীরব চাওয়াকে মূল্যায়ন করে চমকে দেওয়া যায়, তবে আনন্দটা হয় নিবিড়। সব সময় সম্ভব হয়তো হয় না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কী!
আরেকজনের কথা বলি। তাঁর খুব ইচ্ছা, একটা ঈদ বাবার বাড়ি করবেন। কিন্তু এই প্রস্তাবে বেজায় বেজার স্বামী। ঈদ এলেই বাসায় মুখ কালো করে সবাই ঘোরাফেরা করে। অন্য সময়েও খুব একটা ঘোরাঘুরি করেন না স্বামী। স্বামীর কাছে ছুটি মানে বিছানায় শুয়ে থাকা। রাস্তায় বেরোলেই নাকি যানজট; অহেতুক যাতায়াত খরচ তাঁর পছন্দ না।

সঙ্গীর এই চাওয়া-পাওয়া তেমন বড় কিছু নয়। অসাধ্য তো নয়ই। এ জন্য দরকার সদিচ্ছা। মার্কিন সাংবাদিক ও দার্শনিক হেনরি জর্জ (১৮৩৯-১৮৯৭) বলেছিলেন, মানুষই একমাত্র প্রাণী, যার চাওয়া-পাওয়া অফুরন্ত। সে তৃপ্ত হয় না কখনো। এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি মানুষই একমাত্র প্রাণী যে তার প্রিয়জনের চাওয়াকে পূরণ করে।

একজন ভদ্রলোক এলেন আমার কাছে। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী। অভিযোগ হলো, তিনি হইহুল্লোড় পছন্দ করেন। ‘আমি চাই জন্মদিনের রাতে আমাকে ও শুভেচ্ছা জানাবে। বিবাহবার্ষিকী নিজেদের মতো উদ্যাপন করব। এমনকি স্বজন-পরিজনের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনও মনে রাখতে চাই। এদিনগুলো আমার কাছে অনেক বিশেষ বলে মনে হয়। কিন্তু আমার স্ত্রী এ ব্যাপারে কেমন যেন নিরামিষ প্রকৃতির। ওকে আমি আমার পাশে সব সময় চাই। কিন্তু ওর কথা—এসব কী দরকার। জন্মদিন-মৃত্যুদিন নিয়ে এত আদিখ্যেতা কেন? অথচ এই সামান্য কাজটাতে যে আমি কী খুশি হই, ওকে বোঝাতে পারি না।’

সঙ্গীকে যদি বুঝতে না পারেন
সঙ্গীর সূক্ষ্ম অনুভূতি বোঝার দায়িত্ব প্রত্যেক সঙ্গীরই। এতে ভালোবাসা গাঢ় হয়। সব সময় একটা সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। তা না হলে আপনি আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকবেন। যখন টের পাবেন তখন রশি টেনে ধরার সময় থাকবে না। মানসিক দূরত্বগুলো বেশ বড় হয়ে দেখা দেবে। মনের গোপন কষ্ট হিসেবে এগুলো লালন করতে থাকবেন। পরে যতই জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন না কেন, তা বোধ হয় আর সেভাবে জোড়া লাগে না। সক্রেটিসের কথায় বলি, গভীরতম আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতায় যদি কখনো জগদ্দল বিষণ্নতার জন্ম হয়, তখন!

এসব সূক্ষ্ম বিষয় অনেকের কাছে ন্যাকামি মনে হয়। কেউ হয়তো বা কাজের অজুহাতে অবহেলা করেন। হঠাৎ মাথাব্যথা হলো বা জ্বর। খেতে ইচ্ছে করছে না। পাশে কেউ বসলে বা পানিটা এগিয়ে দিলে কার না ভালো লাগে। সেই সময়টা বেশ নিঃসঙ্গ লাগে। ছোটবেলার দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মা-বাবার উৎকণ্ঠায় আদরে ভরা হাত অনুভব করেন অনেকে। তাঁদের সেই স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে। বাস্তবে তা সব সময় সম্ভব না। তবু চাওয়া-পাওয়া, সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে থাকে। সাধারণত মেয়েরা স্বামীর মনমানসিকতা বুঝে চলার চেষ্টা করেন। ব্যতিক্রমও ঘটে। কিছু সমস্যা আছে সংসারে। স্বামী যদি স্ত্রীর ভালো লাগা, মন্দ লাগার মূল্যায়ন করেন তবে অনেকে তাঁকে ‘স্ত্রৈন’ বলতে থাকে। তাঁর পৌরুষে সেটা লাগতে পারে।
সমস্যা থাকবেই। সমস্যাকে পাশে ফেলে সুখ-অসুখের ব্যাপারগুলো দেখতে হবে। একে অপরের পাশে সুখেও যেন থাকি। তেমনি থাকি যেন অসুখেও। চাওয়া-পাওয়ার অপূর্ণতায় সে যেন নিঃসঙ্গ না হয়ে পড়ে। টেস্টামেন্ট অব ইয়ুথ, টেস্টামেন্ট অব ফ্রেন্ডশিপ বইখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ভেরা ব্রিটেন (১৮৯৩-১৯৭০) বলেছিলেন, স্বামীর পছন্দ প্রিয়তমা স্ত্রী জানবে না; স্ত্রীর প্রত্যাশা স্বামী পূরণ করবে না—তবে সেটা তো দাম্পত্য জীবন নয়। তারা তো অচিনপুরের বাসিন্দা।

কী লাভ, কী ক্ষতি—এই টানাপোড়েন নিয়ে বন্দী থাকলে চলবে না। স্বামী-স্ত্রীর মানসিক দূরত্ব যত কম হবে ততটাই মঙ্গল। নিজেদের ছোট্ট ইউনিটকে যতটা সমঝোতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবেন, ততই মঙ্গল আপনাদের।
মার্কিন শিক্ষাবিদ ও সম্পর্ক পরামর্শক ডেভিড এলান বেডনার (১৯৫২-) বিষয়টা দেখেছেন এভাবে, মজবুত সম্পর্কের ভিত্তি হলো মানুষগুলোর পরস্পরের ভালোবাসা, আস্থা। পারস্পরিক বোঝাপড়া। একে অন্যের ছোট ছোট চাওয়াকেও অবহেলা না করা। সামান্য কোনো চাওয়া যখন পূরণ হয়, তা অসামান্য সন্তুষ্টির উৎস হতে পারে। আরও বড় কথা, এসবের মধ্যে সন্তানসন্ততিরাও তাদের সুখ-স্বস্তির ঠিকানা ও দিশা খুঁজে পায়।

যা করতে পারেন
* কালজয়ী রম্যলেখক জেমস এইচ বোডেনের (১৯২৫-২০১০) পরামর্শ হলো, এক অন্যকে জানতে বুঝতে হবে। অন্যজনের চাওয়াকে মর্যাদা দিতে হবে। সময়ের চাওয়া সঠিক সময়েই পূরণ করতে হবে, ফেলে রাখলে চলবে না।
* সঙ্গীকে অনুভব করার আগ্রহ বাড়াতে হবে। একজন করলেই না অন্যজন এগিয়ে আসবে। লেনদেনের এই দুনিয়ায় মনের জগতেও লেনদেনের ব্যাপার রয়েছে। জীবনকে সুন্দর সাবলীল করতে দুজনের বোঝাপড়া জরুরি। চলতি কাজের চাপ, ক্লান্তি, হতাশা, সাময়িক রাগ-অভিমান—কোনো কিছুই যেন নিজেদের এই সূক্ষ্মÿঅনুভূতিগুলো নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে দুজনকেই খেয়াল রাখতে হবে।
* মার্কিন লেখক-প্রকাশক-কথক শেরি এল ডিউ (জন্ম ১৯৫৩) কথাগুলো চমৎকার। বলেছেন, সর্বোপরি জীবন হলো এক ব্যাগভর্তি ভালোবাসা ও ভালোবাসার নিয়মিত পরীক্ষা। যার মধ্যে রয়েছে পরস্পর বিশ্বাস, আস্থা, চাহিদা, ইচ্ছা, অগ্রাধিকার, ধৈর্য; একে অন্যকে বোঝার ক্ষমতা, আন্তরিকতা; নিজের চাওয়াগুলো যেমন জানাতে হবে; প্রত্যাশা লুকিয়ে রাখলে চলবে না। তেমনি অন্যের ইচ্ছাপূরণের সদিচ্ছা জীবন নামক ব্যাগকে ভরিয়ে তুলবে সুখের নিশ্বাসে।

Related Posts

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *